হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের আলেম ও ধর্মপ্রচারক সাইয়্যেদ ফয়যান হায়দার জাওয়াদি নাজাফ আশরাফ থেকে কারবালা মুআল্লার পদযাত্রাপথে হাওজা সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আরবাঈনে হুসাইনি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি ইসলামী বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক ও মানবিক আন্দোলন।
তিনি বলেন, আরবাঈন শুধু শোকানুষ্ঠান নয়; এটি মানুষের সঙ্গে আল্লাহ, আহলে বাইত (আ.), সমাজ এবং সমগ্র মানবজাতির সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের এক অনন্য সুযোগ। আরবাঈন মানুষকে শিক্ষা দেয় কীভাবে ঈমান, জ্ঞান, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের সেবাকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হয়।
আরবাঈন: জ্ঞান, দূরদৃষ্টি ও দায়িত্ববোধের বার্তাবাহক
হুসাইনি আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্পর্কে তিনি বলেন, আরবাঈনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির ভিত্তিতে জীবন গঠন। ইমাম হুসাইন (আ.) মানবজাতিকে শিখিয়েছেন যে, জ্ঞান, সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের প্রস্তুতি ছাড়া ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না। তাই আরবাঈনের পদযাত্রা শুধু শারীরিক সফর নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা এবং জীবনের লক্ষ্য পুনর্বিবেচনার একটি আধ্যাত্মিক সফর।
নাজাফ থেকে কারবালা: নৈতিকতা ও মানবতার বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয়
তিনি নাজাফ থেকে কারবালার পথকে নৈতিকতার বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয়” আখ্যা দিয়ে বলেন, এই পথে যাত্রীরা ধৈর্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, সেবা, ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা এবং অন্যের প্রতি সম্মানের মতো মূল্যবোধ বইয়ের পাতায় নয়, বরং মানুষের বাস্তব জীবন ও আচরণের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির লাখো মানুষের একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে একত্রে চলা ইসলামের শিক্ষা ও আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শের সার্বজনীনতার এক জীবন্ত উদাহরণ। এটি এমন এক দৃশ্য, যেখানে মানবিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও সমতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ ঘটে।
আরবাঈনে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড-ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা
জাওয়াদি বলেন, আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শ ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ নয়। আরবাঈন বিশ্বকে প্রমাণ করেছে যে, তাঁদের শিক্ষা আজও আধুনিক মানুষকে পথ দেখানোর সক্ষমতা রাখে। এই বিশাল সমাবেশে কোনো জাতি, ভাষা বা দেশের মানুষের অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই; বরং একমাত্র মানদণ্ড হলো ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিক সেবা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার মনোভাব।
আরবাঈন: তরুণ প্রজন্মের চরিত্র গঠনের আদর্শ
তিনি বলেন, আজকের পৃথিবী চিন্তার বিভ্রান্তি, বস্তুবাদ এবং নৈতিক সংকটের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে আরবাঈন তরুণদের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য, সামাজিক দায়িত্ব, ধর্মীয় পরিচয় এবং উত্তম চরিত্র গঠনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যদি তরুণরা আরবাঈনের প্রকৃত বার্তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তবে তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রদূত এবং মানবিক ও ইসলামী মূল্যবোধের দূত হয়ে উঠতে পারবে।
আরবাঈন: সংলাপ, দাওয়াত ও ইসলামী উম্মাহর ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম
তিনি বলেন, আরবাঈনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামী শিক্ষা প্রচার ও পরিচয়ের জন্য এটি এক অনন্য সুযোগ। এই কোটি মানুষের সমাবেশে বিভিন্ন দেশের যাত্রীরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন এবং ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এই ব্যাপক যোগাযোগ মুসলমানদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে এবং বিশ্ববাসীর কাছে আশুরার সংস্কৃতি ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষাকে পরিচিত করার মূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করে।
আরবাঈনের প্রকৃত বার্তা তুলে ধরতে গণমাধ্যমের দায়িত্ব
সাইয়্যেদ ফয়যান হায়দার জাওয়াদি বলেন, আজ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনমত গঠনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী। তাই আরবাঈনের প্রকৃত ও বিশুদ্ধ বার্তা বিশ্বজনমতের কাছে পৌঁছে দেওয়া সব মুসলিম, চিন্তাবিদ, ধর্মপ্রচারক ও গণমাধ্যমকর্মীর যৌথ দায়িত্ব।
তিনি বলেন, বিশ্বকে জানাতে হবে যে, আরবাঈনের এই বিশাল সমাবেশ ঘৃণা, সহিংসতা বা উগ্রবাদের প্রতীক নয়; বরং এটি ভালোবাসা, শান্তি, আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, মানবসেবা এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার সর্ববৃহৎ প্রকাশ। এই সংস্কৃতি কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই লাখো মানুষকে একত্রিত করে।
কারবালা: ন্যায়বিচারের চিরন্তন পতাকা
তিনি বলেন, আশুরার আন্দোলন সর্বজনীন ও কালজয়ী। পৃথিবীর যেখানেই অন্যায়, বৈষম্য, শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন থাকবে, সেখানেই কারবালার বার্তা জীবন্ত ও অনুপ্রেরণাদায়ক থাকবে। ইমাম হুসাইন (আ.) কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা জাতির জন্য নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, আরবাঈন বিশ্বের সব মুক্তচিন্তার মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, অন্যায় ও অবিচারের সামনে নীরব থাকা মানবতা ও সভ্য সমাজের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মানুষের ভাগ্যের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া হুসাইনি আদর্শের অন্যতম প্রধান শিক্ষা।
জীবনধারায় আরবাঈনের বার্তার ধারাবাহিকতা
তিনি আরবাঈনের যাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, এই আধ্যাত্মিক সফর কেবল জিয়ারত ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং এর প্রভাব ও বরকত মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, যদি যাত্রীরা ফিরে এসে সততা, আমানতদারি, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর ইবাদত, মানুষের সেবা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধকে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালীভাবে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এসব মূল্যবোধ পরিবার, সমাজ ও দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হয়, তবে বলা যাবে যে তাঁদের জীবনে আরবাঈনের প্রকৃত বার্তা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এই মহান ইবাদত সফল হয়েছে।
শেষে তিনি হযরত আবা আবদিল্লাহ আল-হুসাইন (আ.)-এর জিয়ারতকারীদের জন্য দোয়া করে বলেন, আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সব জিয়ারতকারীর জিয়ারত কবুল করেন, ইসলামী উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব আরও সুদৃঢ় করেন, বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষকে সাহায্য করেন এবং আমাদের সবাইকে আহলে বাইত (আ.)-এর আলোকিত পথে অবিচল রাখেন, যাতে আমরা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিশ্বজনীন ও চিরন্তন বার্তা পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে দিতে পারি।
আপনার কমেন্ট